বিঃ দ্রঃ শুরুতেই বলে রাখা ভাল, সম্প্রতি আমার এক বোনের মৃত্যু আমাকে এ লেখাতে উদবুদ্ধ করেছে। আর ইংরেজিতে না লিখে বাংলায় লিখছি কারণ আমি চাইনা আমার গবেষণাধর্মী লেখার সাথে এটাকে মিলিয়ে ফেলে অবাঙ্গালীরা আমার গবেষণাকে ভুল বুঝুন, তবে কেউ ট্রান্সলেট করে পড়লে কোন আপত্তি নেই, লুকানোর কিছু নেই এতে।
খুব ছোট বেলা থেকেই আমি মৃত্যুকে ভয় পেতে শুরু করি। না মস্তিষ্ক বিকৃত ছিল না আমার। আশে পাশে লোকজনের মৃত্যু দেখে ভয় হতে থাকে যে আমার বাবা মা কখন মরে যাবে আর আমি একা হয়ে যাব। শুধু ভয়ে আমি আঁতকে থাকিনি। খুঁজতে শুরু করি এর কি সমাধান থাকতে পারে। প্রাথমিক ভাবে এই ভয়ের কারণে আমার বেশ কিছু অভ্যাসগত সমস্যা দেখা দেয়। যেমন, সময়ের ব্যাপারে অতি সতর্কতা, ঘর থেকে দূরে যেতে আপত্তি ইত্যাদি। এমনকি এক পর্যায়ে হন্যে হয়ে বন্ধু আর জীবনসঙ্গী খুঁজেছি; কারণ একটাই – একা হতে চাইনা। এটা কোন রোমান্টিক চিন্তা ছিল না, নিতান্তই প্রাণ বাচানোর জন্যে। আমার এসব ভয়াবহ ভাবনার প্রথম শুরু যখন আমি প্রায় ৫ বছর বয়সী। অস্বস্তিতে কাউকে এগুলো বলতাম না। শুধুই একা একা সমাধান খুঁজতাম, মাঝে মাঝে বিষণ্ণ বোধ করতাম।
এর পর বহু বছর কেটে গেছে। ২০০৪ সালে বড় ছেলে সিয়ামের মৃত্যু প্রথম আমাকে বুঝিয়ে দেয়, মৃত্যুকে জয় করতে বন্ধু বা জীবন সঙ্গী যথেষ্ট নয়। গবেষণার কাজ শুরু করি Death and Adjustment Hypotheses দিয়ে। সে সময় প্রথম বুঝতে পারি, নিজেকে মুসলিম দাবি করলেও বাস্তবতায় আমি পরকালকে প্রায় মানি না বললেলই চলে, ফলে মৃত্যু আমার চোখে এক অবাস্তব দানব, এক ছোবলে সব শেষ, সব। কিন্তু মন মানল না। আমি খুব আন্তরিক ভাবে আল্লাহ্কে বিশ্বাস করি বলেই জানতাম, আমার তো পরকাল, অর্থাৎ মৃত্যুর পরের জীবনে সন্দেহ থাকার তেমন কারণ নেই।
গবেষণার এক পর্যায়ে বুঝতে পারলাম এর কারণ কি হতে পারে। পরকালকে আমি বিচার ছাড়া ভাবতে পারি না, আর সেই বিচারের কথা মাথায় আসলে দুনিয়ার আনন্দ ফুর্তি শান্তি সব ওলট পালট হয়ে যায়। ফলে বেশির ভাগ সময়ে আমি পরকালকে ভুলে থাকতেই নিরাপদ বোধ করতাম। আর করব নাই বা কেন, কত কত আনন্দ চারপাশে, এগুলো নাকি অধিকাংশই নিশিদ্ধ। এমনকি, ছোট বেলায় ধর্ম শিক্ষকরা সৃষ্টিকর্তাকে এক দানবীয় চরিত্র হিসাবে পরিচিত করিয়েছেন, যিনি কথায় কথায় আগুনে ঝলসে দেন, তাঁর ভালবাসা নিয়ে তেমন কিছুই জানা ছিলনা, যেমনটা শাসনের দিকটা জানতাম।
যাহোক বুঝতে পারলাম, মৃত্যুকে জেনে, পরকালের বিচারকে মেনে স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য আমার সর্বপ্রথম যেটা দরকার তা হল, আল্লাহ্ আমার কতটা কাছের, তিনি কতটা ক্ষমাশীল এবং দয়ালু এটা মাথায় রাখা, বাকি সব আসবে পরে। এতে লাভ হল, পরকাল মাথায় রাখতে বাধা কমে গেল। ফলে মৃত্যু ব্যাপারটা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে আসল। অন্য মানুষের জন্য গবেষণায় বিস্তারিত কাজ করলাম – কেন মৃত্যুতে সব শেষ ভাবা ঠিক নয়, ধর্ম বিশ্বাস থাকুক বা না থাকুক।
২০১৩ আর ১৪ তে সুযোগ এলো এসব তত্ত্ব কথা পরীক্ষা করার। না, কোন সাজানো গবেষণা দিয়ে নয়, সত্যিকারের মৃত্যু দিয়ে। ১৩ সালে বাবা আর ১৪ সালে মা মৃত্যু বরণ করলেন। মহান আল্লাহর অশেষ রহমত, তখন আমি প্রাণপণে তাদের পরকালকে সুন্দর করার চেষ্টা করেছি, ফলে তাদের দৈহিক অনুপস্থিতি নিয়ে মাতম করার সময় সুযোগ ছিলনা, ইচ্ছাও হয়নি।বরং মনে এক রকম শান্তি ছিল যে তারা এই নোঙরা দুনিয়ার কষ্ট থেকে বেঁচে গেছে এবং আশা করলাম আল্লাহ্ তাদের ক্ষমা করবেন এবং ভাল রাখবেন; আর আমার মৃত্যুর পর তাদের আবার দেখার আশা থাকল – ঠিক যেমন দুনিয়ার লোকজনকে দেখার আশা রাখি। তবে এটা শুরুতে সহজও ছিলনা। এটাই আমার জীবনে প্রথম সত্যকারের মৃত্যু নিয়ে কাজ, অর্থাৎ পরকালকে সত্য মেনে যে মৃত্যু, তাকে মোকাবেলা করা। বুঝতে পারলাম, এভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া সম্ভব, যদিও তা সব সময়ই কষ্টদায়ক – কম বা বেশি।
এরপর ২০১৬ তে দেশ ছাড়ার অভিজ্ঞতা আমাকে বোঝাল, যন্ত্রণাদায়ক জীবনের চেয়ে শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক মৃত্যু অনেক সময় বেশি কাম্য। তবে শর্ত হল, তার জন্য আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট রেখে চলতে হবে, নাহলে বিশ্বাসীর সব শান্তি শেষ।সৌভাগ্যবশত, জীবনে পরিবর্তন আসল, আল্লাহ্ নতুন জীবন দিলেন। কিন্তু এই নতুন জীবনে নতুন প্রশ্ন দেখা দিল, এমন যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার মানে কোথায়, এক সময় তো এগুলো সব শেষ হবেই। বাবা মা ছিল, এখন নেই, যারা আছে তারা থাকবে না অথবা আমি তাদের ছেড়ে যাব।
বুঝতে পারলাম আমি এখনও কোন চিরস্থায়ী আকর্ষণের সন্ধান পাইনি, যার জন্য বাঁচা, মরা কিংবা পরকাল যাপন সবই আনন্দের হতে পারে। আসলে এত দিন জীবনের আকর্ষণ হিসাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সব জিনিস আঁকড়ে ধরে স্থির হতে চেয়েছি। অথচ সেই ছোটবেলা থেকে, বা তারও আগে থেকে যাকে চিনি, যার ভালবাসায় বেঁচে আছি তাঁকে প্রায় ভুলেই গেছি। বুঝতে পারলাম কোথায় আমার ঘাটতি। আমাকে মনে রাখতে হবে, সব শেষ হয়ে গেলেও আল্লাহ্ আছেন, থাকবেন; আর তার মত শান্তির আশ্রয় থাকতে, ইহকাল, মৃত্যু, পরকাল, বিচার কোন কিছুকেই আমি আঁকড়ে ধরে শান্তি খুঁজব না।
তাই এখন, কারো মৃত্যু দেখলে আল্লাহর কাছে তার জন্য ক্ষমা আর শান্তি চেয়েই নিজেকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত রাখার কাজ শুরু করি। জানিনা কতদিন বাঁচব, তবে এটা জানি শান্তিতে বাচতে চাই; মরাটা সবচেয়ে স্বাভাবিক একটা ঘটনা, তাই তার জন্য সুন্দর ভাবে প্রস্তুত থেকেই শান্তিতে আর আনন্দে থাকতে চাই। আর যা কিছু আমার দীর্ঘতর জীবনকে নষ্ট করতে পারে, তা থেকে দূরে থাকতে চাই। মৃত্যুর আগে আনন্দ চাই, তবে মৃত্যুর পরের আনন্দ মাটি করে নয়। আশা করি আমার আপণ সবার সাথে মৃত্যুর পর আবারও এক হতে পারব আল্লাহর ইচ্ছায়। আর এতকাল যিনি সবচেয়ে বেশি ভালবাসা দেয়েছেন তাঁকে অসন্তুষ্ট করার ত প্রশ্নই আসে না – কতই না আনন্দ হবে যখন তাঁকে দেখতে পারব।