অধ্যায় তিন – মৃত্যু, সমাজ, আর অমরত্তের ধারণা

মৃত্যু শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় না। এটা সমাজেরও একটা বাস্তব সত্য। আমরা যতই মৃত্যুর কথা ভাবতে না চাই বা এড়িয়ে যেতে চাই, সমাজ আসলে এই নিয়মেই চলে—মানুষ মারা যায়, আর তার জায়গায় নতুন মানুষ আসে।

একজন মানুষ মারা গেলে পরের প্রজন্ম সামনে আসে। বাচ্চারা বড় হয়, দায়িত্ব নিতে শেখে। তারা কাজ করে, পরিবার গড়ে, সমাজে নিজের জায়গা বানায়। আগের মানুষরা যে কাজগুলো রেখে যায়, সেগুলো তারা এগিয়ে নিয়ে যায়। ব্যাপারটা অনেকটা শরীরের মতো—যেমন পুরনো কোষ নষ্ট হয়ে নতুন কোষ আসে, তেমনি পুরনো মানুষ সরে গিয়ে নতুনদের জায়গা করে দেয়।

এখন ভাবুন তো, যদি কেউ কখনোই এমনভাবে না মারা যেত যে সমাজ সামনে এগোতে পারে—তাহলে কী হতো? কেউ নতুন করে বিয়ে করতে পারত না। সম্পত্তি ভাগ করা যেত না। আইনগত আর টাকার দায় একজন মানুষের চারপাশেই আটকে থাকত, যে মানুষটা সমাজ থেকে কখনোই “চলে যায়নি”। দায়িত্ব আর সম্পদের স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে যেত। সমাজ এক জায়গায় আটকে থাকত।

তাই মৃত্যুর পরে কী হয়—এ নিয়ে আমাদের বিশ্বাস যাই হোক না কেন, একটা কথা অস্বীকার করা যায় না—মানুষ মারা যায়, আর সাধারণ জীবনে ফিরে আসে না। পরিবার, সমাজ, আর সভ্যতা ঠিকভাবে চলার জন্য এটা দরকার। এই অর্থে মৃত্যু শুধু স্বাভাবিকই না, সমাজের জন্য দরকারিও।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই একই ঘটনাকে আমরা একটা নির্দিষ্ট ভাবে ভাবতে শুরু করি, মৃত্যু ব্যক্তির জন্য মানসিকভাবে অসহ্য হয়ে ওঠে।

“সবকিছুর শেষ” ভাবনার সমস্যা

ঝামেলাটা শুরু হয় তখনই, যখন আমরা মনে মনে মৃত্যুর মানে ঠিক করি। অনেকের কাছে মৃত্যু মানে শুধু “আমি আর এই দুনিয়ায় থাকব না”—এটা নয়। বরং মানে হয়, “আমি একেবারে শেষ। কোনোভাবেই আর আমার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।”

আমরা আগেই দেখেছি, মৃত্যু এমনিতেই মানসিক চাপ তৈরি করে। এটা সম্পর্ক ভাঙে, জীবনের ছন্দ নষ্ট করে, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা এলোমেলো করে দেয়। কিন্তু এই চাপ ভয়ংকর হয়ে যায় তখনই, যখন আমরা বিশ্বাস করি—মৃত্যু মানে সবকিছু একেবারে মুছে যাওয়া।

আমার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, এখানেই মানুষ মানিয়ে নিতে পারে না। মন মেনে নিতে পারে যে শরীর একদিন কাজ করা বন্ধ করবে। প্রিয় মানুষদের থেকে আলাদা হওয়াটাও কষ্ট হলেও ভাবা যায়। কিন্তু যেটা মন মেনে নিতে পারে না, সেটা হলো এই ধারণা—“আমি” আর কোনো রূপেই আর থাকব না, চিরদিনের জন্য।

আমি যখন এই বিশ্বাসটা ভালো করে খতিয়ে দেখি, তখন দেখি—এটাকে প্রমাণিত সত্য বলা যায় না। এটা খুব প্রচলিত ধারণা, কিন্তু নিশ্চিত জ্ঞান নয়। বরং এই কথাটা বলা বেশি যুক্তিযুক্ত যে মৃত্যু শরীরের জীবন শেষ করে, কিন্তু সব ধরনের অস্তিত্ব শেষ করে দেয়—এটা আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না।

এর মানে এই না যে আমরা বুঝতে পারি মৃত্যুর পরে কী হয়। এর মানে শুধু এই—আমরা এটা বলতে পারি না যে, “মৃত্যু মানেই সবকিছুর চূড়ান্ত শেষ,” আর এটাকে বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবেও দেখাতে পারি না।

এই “সব শেষ” ভাবনাটা যখন আমরা বাদ দিই, তখন মানসিক অবস্থাটা বদলে যায়। শরীরের মৃত্যু তখনো কষ্টের, গুরুতর ব্যাপারই থাকে। ক্ষতি, বিচ্ছেদ, সীমাবদ্ধতা—এসব থাকেই। কিন্তু মনকে আর এমন একটা বিশ্বাস বয়ে বেড়াতে হয় না, যেটা তার ভেতরের টিকে থাকার অনুভূতির সঙ্গে লড়াই করে।

সোজা কথা—সমস্যা মৃত্যু না। সমস্যা হলো, আমরা মৃত্যুকে যেভাবে ব্যাখ্যা করতে শিখেছি।

সমাজের দরকার আর মনের বোঝা

সমাজের দিক থেকে দেখলে, একজন মানুষের মৃত্যু দায়িত্ব আর সম্পদকে সামনে এগোতে দেয়। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমরা নিজের মৃত্যুকে যেভাবে কল্পনা করি, সেটাই অনেক সময় আমাদের সহ্যের বাইরে চাপ তৈরি করে।

আমার গবেষণা আর ভাবনা আমাকে খুব সহজ একটা জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে—

  • মৃত্যু নিজে স্বাভাবিক, আর দরকারি।
  • কিন্তু মৃত্যুর সঙ্গে আমরা যে ধারণা জুড়ে দিই—বিশেষ করে “সবকিছুর শেষ”—সেটাই মৃত্যুকে ভয়ের জিনিস বানিয়ে ফেলে।

এই পুরো কাজজুড়ে আমি এই দুইটা জিনিস আলাদা করে দেখার চেষ্টা করেছি। আমি মৃত্যুর বিরুদ্ধে কথা বলছি না। আমি বলছি না মৃত্যু হওয়া উচিত না। আমি শুধু দেখছি—মৃত্যুকে ঘিরে আমরা যে ভাবনাগুলো বানিয়েছি, তার মধ্যে কোনগুলো আমাদের ক্ষতি করছে, আর কোনগুলোর পেছনে শক্ত কোনো প্রমাণ নেই।

মৃত্যু থাকবে। কিন্তু আমরা মৃত্যুকে কী অর্থ দিই—সেটা বদলানো যায়, আর তা দরকারও।

মৃত্যুর ছায়ায় থেকেও অর্থ খোঁজা

এই প্রশ্ন শুধু বইয়ের জন্য না। এটা এসেছে আমার নিজের জীবন থেকে—মৃত্যুর কথা মাথায় রেখেও কীভাবে অর্থ নিয়ে বাঁচা যায়।

আমরা প্রতিদিন দেখি, মানুষ কাজ, পদ, আর টাকার পেছনে অসম্ভব পরিশ্রম করে। অনেকেই দরকারের চেয়েও অনেক বেশি চায়। কারো জন্য এটা ভালো লাগে, আবার কারো জন্য এটা শুধু এক ধরনের অস্থিরতা হয়ে দাঁড়ায়।

এক সময় আমি এটা দেখে খুব অস্বস্তি বোধ করি। আমি গরিব হতে চাইনি, অসহায়ও না। কিন্তু এমন জীবনও চাইনি যেখানে সারাক্ষণ খেটে যাওয়ার কোনো গভীর মানে নেই। শেষে আমি একটা মাঝামাঝি পথ খুঁজে পাই—ভালোভাবে বাঁচার মতো আয়, আর বাকি সময় পরিবার, বিশ্রাম আর শেখার জন্য। এটা আমার কাছে বেশি স্বাভাবিক আর মানবিক লেগেছে।

কিন্তু মৃত্যুর কথা ভাবলেই আবার প্রশ্ন আসে। যদি শেষে সবকিছু শূন্য হয়ে যায়, তাহলে এত কিছুর মানে কী? কাজ, চরিত্র, পরিবার, জ্ঞান—সব বানিয়ে শেষ পর্যন্ত কিছুই না? এটা হতাশা ছিল না, এটা ছিল যুক্তির প্রশ্ন।

আমি কখনো আত্মহত্যার কথা ভাবিনি। কিন্তু আবার শুধু নিয়ম মেনে, ভেতরের আগ্রহ ছাড়া বেঁচে থাকাও ঠিক মনে হতো না। এক সময় জীবন বাইরে থেকে ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু ভেতরে ফাঁকা লাগছিল। যা করার দরকার করতাম, কিন্তু মনে হতো না যে এটা সত্যি কোনো বড় অর্থ রাখে।

চারপাশে দেখি, অনেক মানুষ এসব প্রশ্নে মাথা ঘামায় না। তারা বোকা না। তারা শুধু নিজের মৃত্যুর কথা ভাবতে চায় না। এড়িয়ে চলে। দেখলে মনে হয়—আমরা সবাই মিলে মৃত্যুর আসল অর্থটা থেকে পালাচ্ছি।

আমি যত ভাবলাম, তত বুঝলাম—ভয়ের জায়গাটা মৃত্যু না। ভয়টা হলো এই বিশ্বাস—মৃত্যু মানে একেবারে মুছে যাওয়া। এই বিশ্বাস আমাদের ভেতরের টিকে থাকার অনুভূতির সঙ্গে সাংঘরষিক। আর এটাই অনেক মানুষ সোজাসুজি দেখতে পারে না।

গবেষণা আর অমরতার ইঙ্গিত

আমি এই বিষয়ে কিছু গবেষণাও করি। এতে দেখা যায়, যাদের কাছে মৃত্যুর পরে সব শেষ—এই বিশ্বাসটা কম ছিল, তারা মৃত্যুর সঙ্গে ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারে। তারা নিজের মৃত্যুর কথাও ভাবতে পারে, অতটা কষ্ট পায় না।

আবারও, এতে বোঝা যায় — সমস্যা মৃত্যু নয়। সমস্যা হলো, আমরা মৃত্যুর পরের অস্তিত্বকে কীভাবে ভাবি। আর এটাও বুঝলাম, আমি একা না। অনেক মানুষই ভেতরে ভেতরে “একেবারে শেষ” ভাবনাটা সহ্য করতে পারে না, যদিও সেটা ঠিকভাবে বলতে পারে না।

এখান থেকে একটা সহজ ছবি তৈরি হয়—

আমরা বাঁচি। এমনভাবে বাঁচি, যেটা আমরা আর অন্যরা দেখতে পাই।
এক সময় মৃত্যু আসে। শরীর আর এই দেখা-যাওয়া জীবন শেষ হয়।
কিন্তু হয়তো আমাদের সবকিছু একেবারে শেষ হয় না। হয়তো কোনোভাবে কিছু থেকে যায়—যেটা জীবিতদের চোখে ধরা পড়ে না।
যদি এমন হয়, তাহলে জীবনের মানেও বদলে যায়।

আমি এটাকেই “অমরতা” বলি। মানে এই না যে আমরা এই শরীরেই চিরকাল বাঁচব। বরং মৃত্যু পেরিয়েও কোনোভাবে অস্তিত্ব থাকতে পারে।

আমি জানি, এটা প্রমাণ করা আমাদের ক্ষমতার বাইরে। কিন্তু অন্তত এটুকু বলা যায়—

  • মৃত্যু মানেই সবকিছুর শেষ—এটা প্রমাণিত নয়।
  • কিছু না কিছু ধারাবাহিকতা থাকার সম্ভাবনা খোলা আছে।
  • এই ভাবনাটা মানুষের মনের সঙ্গে বেশি মানানসই।

এই সম্ভাবনাটাই আমার জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছে। যদি অস্তিত্ব কোনোভাবে চলতে থাকে, তাহলে এই জীবনটা অর্থহীন কিছু না। এটা বড় একটা গল্পের প্রথম অংশ।

মৃত্যুর সঙ্গে সুস্থভাবে বাঁচা

এখানে অমরতা মানে কখনো না মারা যাওয়া না। বরং মৃত্যুকে আমরা “শেষ” বললে, সেটা নতুন করে ভাবা।

শরীর বুড়ো হবে, দুর্বল আর ধ্বংস হবে। সমাজে দায়িত্ব বদলাবে। এটা স্বাভাবিক।
কিন্তু আমরা বিশ্বাস করতে বাধ্য নই যে মৃত্যু মানে নিজের সবকিছু মুছে যাওয়া।

যদি আমরা শুধু “চূড়ান্ত শেষ” ভাবনাটা বাদ দিই, তাহলে হয়তো আমরা মৃত্যুর সঙ্গে শান্তিতে থাকতে পারব।

এইভাবে জীবন আবার অর্থ পায়। মৃত্যু আর সবকিছুর পরিপন্থি হয়ে থাকে না। মন আর দুই বিপরীত ধারণার মাঝে আটকে থাকে না।

এই অধ্যায়ের মূল কথা দুটো—

  • মৃত্যু স্বাভাবিক, দরকারি, আর সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
  • কিন্তু মৃত্যু আমাদের জন্য কী মানে রাখে—এই ব্যাখ্যাটা আমাদের হাতেই। আর এখানেই আসল মানসিক সমস্যা তৈরি হয়।

পরের অধ্যায়গুলো দেখাবে—মৃত্যুকে একটু অন্যভাবে বুঝলে কীভাবে মানসিক সুস্থতা আর জীবনের উদ্দেশ্য ফিরে আসতে পারে।

Leave a comment