মৃত্যু কেন আমাদের মনে এত ভেতরের চাপ তৈরি করে, সেটা বুঝতে হলে আগে আমাদের বুঝতে হবে—মানুষ মৃত্যু সম্পর্কে কী ভাবে, আর সেই ভাবনাটা তাদের জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলে। প্রত্যেক মানুষের মাথার ভেতরে মৃত্যুর একটা নিজস্ব ধারণা থাকে, সে সেটা কখনো ভাষায় প্রকাশ করুক বা না করুক। এই ভেতরের ধারণাটাই ধীরে ধীরে ঠিক করে দেয়—কেউ অসুস্থ হলে আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাই, কারো মৃত্যু হলে আমরা কীভাবে শোক করি, বয়স বাড়লে আমরা কী অনুভব করি, আর সবচেয়ে সাধারণভাবে—একদিন আমরা নিজেও মারা যাব—এই ভাবনাটা আমরা কীভাবে বই।
এই অধ্যায়ে যখন আমরা “মৃত্যুর সাথে অভিযোজন” বলছি, তখন আমরা কোনো বৃদ্ধ মানুষ, মৃত্যুপথযাত্রী রোগী, বা খুব শিগগির মারা যাচ্ছেন—এমন কাউকে বোঝাচ্ছি না। আমরা কথা বলছি সাধারণ, মোটামুটি সুস্থ একজন মানুষের কথা, যার মৃত্যু ভবিষ্যতের কোথাও আছে, কিন্তু ঠিক কবে—তা জানা নেই। এমন মানুষের জন্য মৃত্যু মূলত একটা জ্ঞান—এই জানা যে, “একদিন আমি মারা যাব।” শুধু এই জানাটাই মানুষের মনে চাপ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট।
এই চাপ সামলানোর প্রথম ধাপ হলো—মানুষটার নিজের মনে মৃত্যু মানে কী, সেটা বোঝা। কেউ যদি মৃত্যুকে সবকিছুর শেষ ভাবে, কেউ যদি মনে করে এটা একটা পরিবর্তন, কেউ যদি শাস্তি ভাবে, কেউ শান্তি ভাবে—এই ধারণা না বুঝে তাকে সত্যিকারের সাহায্য করা যায় না। আমার নিজের কাজের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি—মানুষ নিজের মৃত্যুকে ভেতরে ভেতরে কীভাবে দেখে, এই প্রশ্নটা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। আমরা কথা বলি—মানুষ অন্যের মৃত্যুতে কীভাবে শোক করে, মরণাপন্ন রোগীরা কীভাবে সামলায়, শিশুরা কীভাবে মৃত্যু শেখে। কিন্তু খুব কমই আমরা জিজ্ঞেস করি—একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজের মৃত্যুর কথা জেনে কীভাবে বেঁচে থাকে?
কেন মৃত্যুর সাথে অভিযোজন দরকার
মৃত্যু মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর চাপগুলোর একটাকে স্পর্শ করে। আমরা যা কিছু করি—খাওয়া, কাজ করা, বিশ্রাম নেওয়া, অন্যদের যত্ন নেওয়া, নিজেকে রক্ষা করা—সব কিছুর ভেতরে একটা মূল লক্ষ্য থাকে: বেঁচে থাকা। টিকে থাকার ইচ্ছা মানুষের সবচেয়ে গভীর প্রয়োজনগুলোর একটি। কিন্তু যখন আমরা বুঝতে পারি যে একদিন মৃত্যু এসে এই টিকে থাকাকেই পুরোপুরি থামিয়ে দেবে, তখন সেই জ্ঞানটাই স্বাভাবিকভাবে ভয় আর উদ্বেগ তৈরি করে।
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটা ছোট কোনো বিষয় নয়। মানুষের বেঁচে থাকার তাগিদ খুব গভীর একটা প্রবৃত্তি। মৃত্যু সেই প্রবৃত্তির জন্য সরাসরি হুমকি। তাই মানুষ সচেতনভাবে বা অচেতনভাবে—যেভাবেই হোক—মৃত্যুর বিষয়টাকে সামলানোর চেষ্টা করে।
মানুষের একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে—আমরা ভবিষ্যতের ঘটনা সম্পর্কে জেনে আগেভাগে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারি। তাত্ত্বিকভাবে এতে করে আমরা মৃত্যুর জন্যও আগে থেকেই কিছুটা মানিয়ে নিতে পারি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়—এই মানিয়ে নেওয়াটা খুব কম ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ হয়।
দীর্ঘমেয়াদি চাপ হিসেবে মৃত্যু
ইতিহাস জুড়ে সমাজ মৃত্যুর চাপ সামলানোর চেষ্টা করেছে—সংস্কৃতি, ধর্ম, দর্শন, আর সামাজিক নিয়মের মাধ্যমে। নিজের মৃত্যুর ভয় নতুন কোনো বিষয় না; এটা সব যুগেই মানুষকে ভাবিয়েছে। সমস্যা হলো—মৃত্যু এমন একটা ঘটনা, যার পরে আর কোনো সময় থাকে না মানিয়ে নেওয়ার জন্য। তাই মানিয়ে নেওয়ার কাজটা মৃত্যুর আগেই করতে হয়—শুধু জ্ঞান, বিশ্বাস আর কল্পনার সাহায্যে।
মনোবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে বোঝার চেষ্টা করেছেন—মানুষ এই চাপের জবাব কীভাবে দেয়। এখানে দুইজন চিন্তাবিদের কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রয়েড বলেছিলেন—মানুষ আসলে নিজের মৃত্যুকে বিশ্বাসই করে না। আমাদের অবচেতন মন নিজের না-থাকা কল্পনা করতে পারে না। তাই যেটাকে আমরা মৃত্যুভয় মনে করি, সেটা আসলে ভেতরের অন্য কোনো অমীমাংসিত দ্বন্দ্বের রূপ।
এর বিপরীতে আর্নেস্ট বেকার বলেছিলেন—মৃত্যুর সচেতনতা মানুষের সবচেয়ে গভীর উদ্বেগের উৎস। এই ভয় এত শক্তিশালী যে মানুষের অনেক দৈনন্দিন কাজকর্ম, ভয়, আর আচরণ আসলে মৃত্যুভয়কে অস্বীকার বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা।
পরে আরও গবেষণা দেখিয়েছে—যাদের আত্মসম্মানবোধ ভালো, তাদের মৃত্যুভয় সাধারণত কম হয়। আবার কেউ কেউ মৃত্যুকে বেশি ভয় পায়, কারণ তারা মনে করে—জীবনে অনেক কিছু অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
আমার নিজের কাজে আমি ডেথ অ্যান্ড অ্যাডজাস্টমেন্ট হাইপোথিসিস প্রস্তাব করি। আমি দেখিয়েছি—মৃত্যুর সাথে খারাপভাবে মানিয়ে নেওয়ার একটা বড় কারণ হলো এই বিশ্বাস: মৃত্যু মানে অস্তিত্বের সম্পূর্ণ শেষ। শুধু শরীর নয়, মানুষ হিসেবে সবকিছু একেবারে মুছে যাওয়া। আমার ধারণা হলো—এই বিশ্বাসটা যদি বদলানো যায়, তাহলে মৃত্যুর সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। তবে এটাও বলেছি—নৈতিকতা আর সমাজের নৈতিক মান একটা পর্যায়ে না পৌঁছালে এই পরিবর্তন সহজ হয় না, কারণ মৃত্যু আর নৈতিক ধারণা খুব গভীরভাবে জড়িত।
সাধারণ ধারণা: মৃত্যু মানে অস্তিত্বের শেষ
ধর্ম, সংস্কৃতি, আর বিজ্ঞান—সবাই মৃত্যুকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে। ধর্ম বলে—পরকাল, বিচার, পুনর্জন্ম। বিজ্ঞান বলে—হৃদস্পন্দন থামা, মস্তিষ্কের কাজ বন্ধ হওয়া। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাটা খুব সোজা আর কঠিন: মৃত্যু মানে জীবনের শেষ, আর জীবন মানেই অস্তিত্ব। তাই অনেকের মনে ধীরে ধীরে মৃত্যু হয়ে দাঁড়ায়—“আমার অস্তিত্বের শেষ।”
মানুষ মুখে বলতে পারে—“একদিন আমি মারা যাব।” কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিজের পুরো না-থাকা মানিয়ে নিতে পারে না। এই কথার সাথে অনুভূতির এই ফাঁকটাই মৃত্যুভয়ের মূল জায়গা।
সমাজে মৃত্যুর ধারণা কীভাবে বদলেছে
ইতিহাসবিদ ফিলিপ আরিয়েস দেখিয়েছেন—মধ্যযুগ থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত পশ্চিমা সমাজে মৃত্যুর ধারণা কীভাবে বদলেছে।
এক সময় মৃত্যু ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ—খোলাখুলি, পরিচিত, খুব বেশি ভয়ের নয়। পরে মৃত্যু হয়ে ওঠে বিচার আর শাস্তির বিষয়। তারপর ধীরে ধীরে ধর্মীয় দিকটা দুর্বল হলো, কিন্তু ভয় গেল না। উনিশ শতকে মানুষের কষ্টটা বেশি গুরুত্ব পেল—প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা। বিশ শতকে এসে মৃত্যু প্রায় লুকিয়ে ফেলা হলো—হাসপাতালে, পর্দার আড়ালে, কথা না বলার বিষয়।
আমি যখন সাধারণ সুস্থ মানুষের জন্য একটা মডেল দেখি, সেখানে আমি মৃত্যুর ধাপের আগেই আরেকটা ধাপ যোগ করি—বিচ্ছিন্নতা। মানে, মানুষ মৃত্যু নিয়ে না ভাবার চেষ্টা করে।
সব মিলিয়ে মনে হয়—সমাজ ধীরে ধীরে মৃত্যুকে গ্রহণ করা থেকে দূরে সরে গেছে।
মৃত্যুকে ঘিরে মানসিক প্রতিরক্ষা
মানুষ ভয় সামলাতে নানা মানসিক কৌশল ব্যবহার করে। কিছু কৌশল ভালো, কিছু দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা তৈরি করে।
মৃত্যুকে অস্বীকার করা, আড়াল করা, নিজের কথা না ভেবে শুধু অন্যের মৃত্যু নিয়ে কথা বলা—এসব আসলে মানসিক প্রতিরক্ষারই রূপ। কিন্তু ভেতরের ভয় থেকেই যায়। ফলাফল হলো—সমাজ বাইরে বাইরে স্বাভাবিক, কিন্তু ভেতরে একটা চাপ নিয়ে বেঁচে থাকা।
গবেষণা কী বলে
অনেক গবেষণায় দেখা গেছে—ডাক্তার, সাধারণ মানুষ—অনেকে মৃত্যুর কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করে। সংস্কৃতি, ধর্ম, পারিবারিক মূল্যবোধ—এসব মৃত্যুর ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
আমার নিজের গবেষণায়, বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে আমি দেখেছি—যারা মৃত্যুর পর কোনোভাবে অস্তিত্ব চলতে পারে বলে বিশ্বাস করে, তাদের মানসিক অভিযোজন ভালো হয়। আর যারা মৃত্যুকে সবকিছুর শেষ ভাবে, তাদের ভয় আর চাপ বেশি হয়।
মৃত্যুভয় কি সবসময় খারাপ?
ভয় সবসময় খারাপ না। মাঝারি মাত্রার ভয় আমাদের সচেতন করে, শেখায়, দায়িত্বশীল করে। সমাজে নৈতিক আচরণেও মৃত্যুর পরিণতির ধারণা ভূমিকা রেখেছে।
সমস্যা তখনই, যখন ভয় এত বেশি হয় যে মানুষ ঠিকভাবে বাঁচতেই পারে না। ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মৃত্যুর ধারণা আর অভিযোজন একসাথে কাজ করতে হয়।
মৃত্যু কি বৈজ্ঞানিকভাবে পুরো বোঝা গেছে?
বিজ্ঞান মৃত্যু নির্ধারণ করে—কখন শরীর আর কাজ করছে না। কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা হিসেবে মৃত্যু—এটার পুরো ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিতে পারে না।
বিজ্ঞান এখনো প্রমাণ করতে পারেনি যে মৃত্যু মানেই অস্তিত্বের সম্পূর্ণ শেষ। আবার অস্তিত্ব চলতে থাকে—এটাও প্রমাণ করতে পারেনি। তাই “মৃত্যু সবকিছুর শেষ”—এটা বৈজ্ঞানিক সত্য নয়, এটা একটা দার্শনিক অবস্থান।
মানুষের অস্তিত্ব আর তার সীমা
অস্তিত্ব মানে শুধু শরীর নয়। এর ভেতরে আছে সচেতনতা, অনুভূতি, নিজেকে জানার অভিজ্ঞতা। একটা মানুষ আরেকজনের ভেতরের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি কখনো জানতেই পারে না। তাই বাইরে থেকে মানুষের অস্তিত্বের পুরো সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়।
মৃত্যুর পরে এই অভিজ্ঞতা বর্ণনার সুযোগও থাকে না। তাই অস্তিত্বের শেষ বা ধারাবাহিকতা—এই প্রশ্নগুলো স্বভাবতই পুরোপুরি পরীক্ষাযোগ্য নয়।
অমরত্ব: জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে
বিজ্ঞান আয়ু বাড়িয়েছে, কিন্তু শারীরিক অমরত্ব এখনো বাস্তবসম্মত নয়। কোষের বয়স, রোগ, দুর্ঘটনা—সব মিলিয়ে মৃত্যু এখনো জীবনের অংশ।
মৃত্যু এখানে একটা বড় প্রাকৃতিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই দেখা যায়।
আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি—মৃত্যু শরীরের দৃশ্যমান অস্তিত্ব শেষ করে। কিন্তু সব ধরনের অস্তিত্ব শেষ করে—এটা আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না।
মৃত্যুর একটি স্বাস্থ্যকর ধারণার দিকে
এই অধ্যায়ের মূল প্রশ্নে ফিরে আসি—মৃত্যুকে কীভাবে বোঝা উচিত, যাতে সেটা সত্যের কাছাকাছি হয় আর মানসিকভাবে ক্ষতিকর না হয়?
আমরা জানি—
- মৃত্যু মানে সবকিছুর শেষ—এই বিশ্বাস ভয় বাড়ায়
- ইতিহাসে সমাজ বারবার চরম অবস্থানে গেছে
- বিজ্ঞান শরীর বোঝে, অস্তিত্বের শেষ নয়
- মানুষ এমন একটা মৃত্যুর ধারণা চায়, যেটা নিয়ে সে বাঁচতে পারে
মৃত্যুর আদর্শ ধারণা সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—এমন না। কিন্তু এমন দাবি করা উচিত নয়, যেগুলো প্রমাণহীন আর মানসিকভাবে ক্ষতিকর।
সব প্রশ্নের উত্তর না থাকাও ভালো। খোলা প্রশ্ন মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়। কিন্তু “সব শেষ”—এই শক্ত উত্তর মানুষকে ভয় আর অস্বীকারের দিকে ঠেলে দেয়।
এই অধ্যায় পরের অধ্যায়গুলোর ভিত্তি তৈরি করে। যদি আমরা মৃত্যুর ধারণাকে একটু বেশি বাস্তবসম্মত, কম ক্ষতিকর, আর মানুষের মন আর প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারি, তাহলে মৃত্যুর চাপ কমতে পারে—আর আমরা নিজের মৃত্যুর সাথে একটু বেশি শান্তভাবে মানিয়ে নিতে পারি।